২৪ বছর পর পড়াশোনায় ফেরা, ৫১-তে এমবিবিএস পাস
যোগফল প্রতিবেদক:
২৪ বছর পড়াশোনার বাইরে থাকার পর আবারও মেডিকেল কলেজে ফিরে এসে ৫১ বছর বয়সে এমবিবিএস পাস করেছেন মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ। দীর্ঘ বিরতি, পারিবারিক নানা সংকট ও নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তাঁর এই অর্জন এখন অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজের চূড়ান্ত পেশাগত এমবিবিএস পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয় গত ১ সেপ্টেম্বর। ওই পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হন হাবিবুল্লাহ।
হাবিবুল্লাহ ঢাকা মেডিকেল কলেজের ‘কে-৫৩’ ব্যাচের (১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষ) শিক্ষার্থী ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ২০০২ সালে তাঁর এমবিবিএস পাস করার কথা ছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় পড়াশোনা থেমে যায়। দীর্ঘ ২৪ বছর পর তিনি আবার পড়াশোনা শুরু করে ২০২৬ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
হাবিবুল্লাহ জানান, মেডিকেলে পড়ার শুরুতে তাঁর ফলাফল ভালোই ছিল। একপর্যায়ে এক শিক্ষকের সঙ্গে বিরোধসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হয়। একই সঙ্গে পারিবারিক সমস্যাও চলছিল। জুনিয়র শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাস করতে হওয়ায় তিনি মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। একসময় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তাঁর বাবা আবু বক্কর সিদ্দিকও ছিলেন চিকিৎসক। তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায় সিভিল সার্জন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বড় পরিবারের আর্থিক টানাপোড়েনও হাবিবুল্লাহর জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর বাবা ২০০০ সালে এবং মা ২০১৬ সালে মারা যান।
আবারও মেডিকেলে ফেরার সিদ্ধান্ত
২০২৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল হানিফ টাবলুর সঙ্গে দেখা করেন হাবিবুল্লাহ। তখন তিনি দীর্ঘদিনের বিরতি কাটিয়ে আবার মেডিকেলে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা শেষ করার আগ্রহের কথা জানান।
দীর্ঘ বিরতির পর আবার ভর্তি হতে তাঁর প্রায় দুই লাখ টাকা জরিমানা প্রয়োজন হয়। নিজের পক্ষ থেকে এক লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি বন্ধু, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতায় বাকি অর্থ সংগ্রহ করা হয়। এরপর নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি।
হাবিবুল্লাহর এমবিবিএস পাসের পর অধ্যাপক আবদুল হানিফ টাবলু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দন জানান। সেখানে তিনি ২৪ বছর পর হাবিবুল্লাহর এমবিবিএস পাসের বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর অধ্যবসায়ের প্রশংসা করেন।
অধ্যাপক আবদুল হানিফ বলেন, হাবিবুল্লাহর ইচ্ছাশক্তির পাশাপাশি তাঁর বন্ধু ও শিক্ষকেরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ কারণেই এত দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর পক্ষে পড়াশোনা শেষ করা সম্ভব হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এখন ইন্টার্নশিপের অপেক্ষায় আছেন হাবিবুল্লাহ। এরপর সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগবিদ্যায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে চান তিনি।
নিজের এই দীর্ঘ যাত্রা সম্পর্কে হাবিবুল্লাহ বলেন, তিনি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন এবং নিজেকেই বারবার উৎসাহ দিয়েছেন। বন্ধু, সহপাঠী ও শিক্ষকদের সহযোগিতা তাঁকে পথ চলতে সাহস জুগিয়েছে।
তাঁর এই অর্জনকে ইচ্ছাশক্তি ও অধ্যবসায়ের অনন্য উদাহরণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘ বিরতির পরও লক্ষ্য ঠিক রেখে চেষ্টা করলে অসম্ভব বলে কিছু নেই—হাবিবুল্লাহর গল্প যেন সেই বার্তাই দেয়।
অধ্যাপক আবদুল হানিফ মনে করেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের কেউ বিভিন্ন কারণে পিছিয়ে পড়লে শিক্ষকদের আরও যত্নশীল হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর মেন্টরশিপ ও তত্ত্বাবধান থাকলে অনেকেই আবার মূল ধারায় ফিরতে পারবেন।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন