ফুসফুসের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয় যে ৭ অভ্যাস
যোগফল প্রতিবেদক:
বয়স কম হলেও অনেকেরই শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি কিংবা সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব সমস্যার পেছনে বিভিন্ন রোগ ও সংক্রমণের পাশাপাশি দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসও ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিনের কিছু অনিয়ম ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপান, বায়ুদূষণের সংস্পর্শ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মতো অভ্যাস শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে গেলে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া কিংবা অল্প পরিশ্রমেই অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
ফুসফুসের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন সাতটি অভ্যাস সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
১. ধূমপান
ফুসফুসের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর অভ্যাসগুলোর একটি হলো ধূমপান। সিগারেটসহ তামাকজাত পণ্যের ধোঁয়ায় থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক শ্বাসনালি ও ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধূমপানের ফলে ফুসফুসের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষ করে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ ধূমপান। তাই ফুসফুস সুস্থ রাখতে ধূমপান থেকে বিরত থাকা এবং ধূমপায়ী হলে তা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা জরুরি।
২. পরোক্ষ ধূমপান
নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া নিয়মিত শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে শ্বাসযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একে পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়।
বাড়ি, কর্মস্থল কিংবা অন্য কোনো স্থানে দীর্ঘ সময় ধূমপানের ধোঁয়ার মধ্যে থাকলে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই অন্যের ধোঁয়া থেকেও নিজেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা প্রয়োজন।
৩. দূষিত পরিবেশে সুরক্ষা ছাড়া চলাফেরা
যানবাহনের ধোঁয়া, ধুলাবালি, কলকারখানার দূষণ এবং বিভিন্ন ক্ষতিকর কণার সংস্পর্শ নিয়মিত হলে শ্বাসযন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে। রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শও ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের মধ্যে থাকলে শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আগে থেকে থাকা শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাও আরও বাড়তে পারে।
তাই অতিরিক্ত দূষিত পরিবেশে অপ্রয়োজনে দীর্ঘ সময় না থাকা এবং ধুলা, ধোঁয়া বা রাসায়নিক পদার্থের মধ্যে কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
৪. বদ্ধ ঘরে দীর্ঘ সময় থাকা
পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করে না এমন ঘরে দীর্ঘ সময় থাকলে ঘরের বাতাসের মান খারাপ হতে পারে। রান্নার ধোঁয়া, মশার কয়েল, তামাকের ধোঁয়া কিংবা বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া ঘরের ভেতরে জমে গেলে শ্বাসযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে রান্নার সময় পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকলে ধোঁয়া ও ক্ষতিকর কণার সংস্পর্শ বেড়ে যায়। তাই ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা এবং রান্নার ধোঁয়া বাইরে বের হওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি।
৫. দীর্ঘ সময় বসে থাকা
দিনের বড় একটি সময় বসে থাকা এবং শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড শরীরের কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
তাই একটানা দীর্ঘ সময় বসে না থেকে কাজের ফাঁকে হাঁটাচলা করা এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক কর্মকাণ্ডের অভ্যাস করা ভালো।
৬. প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া
সর্দি-কাশি হলেই নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার অভ্যাসও ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ সব ধরনের সর্দি-কাশি বা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকি বাড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর না হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা হলে তাই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৭. পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ না করা
শরীরে পানির ঘাটতি হলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। শ্বাসনালিতে থাকা মিউকাস শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশ। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ শরীরের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
তবে শুধু বেশি পানি পান করলেই ফুসফুসের সব ধরনের রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব—এমন ধারণা ঠিক নয়। ফুসফুস ভালো রাখতে ধূমপান এড়িয়ে চলা, বায়ুদূষণ থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফুসফুস ভালো রাখতে যা করবেন
বয়স বাড়ার সঙ্গে ফুসফুসের কার্যকারিতা কিছুটা কমতে পারে। তবে ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা, বায়ুদূষণের সংস্পর্শ কমানো, ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে ফুসফুসের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ অনুভূত হওয়া, শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া কিংবা অল্প পরিশ্রমেই অতিরিক্ত হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

আপনার মতামত লিখুন