অসময়ে কাটিমনের দাপট, আমের ফলন-দামে হাসি কৃষকের মুখে
যোগফল প্রতিবেদক:
মৌসুমি আমের বাজার শেষ হয়ে গেলেও নওগাঁর সাপাহারে এখনো জমজমাট আমের বেচাকেনা। তবে এবার বাজারে রাজত্ব করছে বারোমাসি জাতের ‘কাটিমন’ আম। মৌসুমের বাইরে এমন আমের সরবরাহ দেখে যেমন অবাক হচ্ছেন স্থানীয়রা, তেমনি ভালো ফলন ও দাম পেয়ে সন্তুষ্ট চাষিরাও।
নওগাঁর আমের বাজারে আম্রপালি, নাকফজলি, হিমসাগর, হাঁড়িভাঙা, ল্যাংড়া ও গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আমের মৌসুম অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সাধারণত এরপর বাজারে আমের সরবরাহ কমে গেলেও গত কয়েক বছর ধরে সেই চিত্র বদলেছে কাটিমন জাতের আমের কারণে।
সারা বছর চাষ করা যায় বলে কাটিমনকে বারোমাসি আম বলা হয়। দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি স্বাদেও আলাদা হওয়ায় মৌসুমের বাইরেও এ আমের চাহিদা রয়েছে। নওগাঁর মধ্যে সাপাহার উপজেলাতেই এ জাতের আমের চাষ ও বেচাকেনা সবচেয়ে বেশি।
বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার (১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর) সাপাহার বাজার ঘুরে দেখা যায়, ভ্যানভর্তি কাটিমন আম নিয়ে কৃষকেরা বাজারে এসেছেন। সারি সারি করে রাখা হয়েছে বিক্রির জন্য। মৌসুমের বাইরে এমন আমের বাজার দেখে স্থানীয়দের অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাদের কাছে বাজারের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে, এখনো যেন আমের ভরা মৌসুম চলছে।
সাপাহারের হরিপুর এলাকার আমচাষি মনসুর আলী বলেন, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছেন। এবার ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি মণ আমের দাম ৮ হাজার টাকা চাইলেও ব্যবসায়ীরা সাড়ে ৬ হাজার টাকা প্রস্তাব দিচ্ছেন। ৭ হাজার টাকা হলে তিনি বিক্রি করবেন। আমের মান ও প্রকারভেদে দাম কমবেশি হচ্ছে।
বালুকাডাঙ্গার চাষি রেজাউল ও সিদ্দিকুর রহমান জানান, এ সময়ে অন্যান্য জাতের আম বাজারে না থাকায় কাটিমনের চাহিদা বেড়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে। আগামীতে এ জাতের আমের চাষ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন তারা।
কাটিমন আম কিনতে আসা স্থানীয় ভোক্তা প্রদীপ বলেন, এ সময় আগে কখনো এত আমের বাজার দেখেননি। চোখের সামনে সুন্দর আম দেখে বাড়ির জন্য কিনেছেন তিনি। একই কথা জানান ক্রেতা নয়ন ও সিরাজ। তাদের মতে, বাজারের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে এখনো আমের মৌসুম চলছে।
গোয়ালা ইউনিয়নের সারোগডাঙ্গা এলাকার চাষি হাফিজুর রহমান ১৬ বিঘা জমিতে কাটিমন আম চাষ করেছেন। তিনি জানান, প্রতি মণ আম প্রায় ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এখনো গাছে মুকুল রয়েছে। নভেম্বর-ডিসেম্বর পর্যন্ত আম পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।
হাফিজুর রহমান জানান, ২০১৯ সালে অনুপ্রেরণামূলক একটি ভিডিও দেখে কাটিমন আম চাষে আগ্রহী হন। ২০২১ সাল থেকে তার বাগানে ফলন শুরু হয়। বারোমাসি হওয়ায় তার বাগানে সারা বছর ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
নিশ্চিন্তপুর এলাকার চাষি নাসির উদ্দিনও ২০১৯ সালে কাটিমনের চারা লাগান। ইউটিউব দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে শুরু করা এই চাষে সফলতা পান ২০২১ সালে। গত বছর ১৫ বিঘা জমিতে চাষ করলেও এবার তা বাড়িয়ে ৩৭ বিঘা করেছেন তিনি। তার বাগানে নয়জন শ্রমিক কাজ করছেন। বর্তমানে বাজারে আমের মানভেদে প্রতি মণ ৬ হাজার ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম পাওয়া যাচ্ছে।
টেংরা কুড়ি গ্রামের কৃষক জামাল উদ্দিন ৬০ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের বাগান করেছেন। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২৫ মণ, কখনো ৩০ থেকে ৩৫ মণ পর্যন্ত ফলন হয়। বর্তমানে প্রতি মণ আম ৪ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এবার তার বাগান থেকে ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার আম বিক্রির আশা করছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, এর আগে অফ সিজনে কাটিমন আমের এত বড় বাজার দেখা যায়নি। এবার সরবরাহ বেড়েছে। বাজারে অন্য জাতের আম না থাকায় কাটিমনের দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। ফলে আগামীতে আরও কৃষক এ জাতের আম চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।
সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাপলা খাতুন বলেন, বর্তমানে উপজেলায় ১৫০ হেক্টর জমিতে কাটিমন আম চাষ হচ্ছে। গত বছর এ পরিমাণ ছিল ৯৭ হেক্টর। ভালো দাম পাওয়ায় চাষিদের আগ্রহ বাড়ছে। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক রেজাউল করিম জানান, সাপাহারের পাশাপাশি পোরশা, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, রাণীনগরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কাটিমন আমের চাষ হচ্ছে। চলতি বছর জেলায় মোট ২৫৫ হেক্টর জমিতে এ জাতের আম চাষ হয়েছে, যা গত বছর ছিল ১৯০ হেক্টর।
তিনি জানান, অন্যান্য জাতের আম সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ে পরিপক্ব হলেও কাটিমনের বিশেষত্ব হলো কৃষকেরা বছরে দুই থেকে তিনবার নিজেদের সুবিধামতো এ আম উৎপাদন ও বাজারজাত করতে পারেন। নওগাঁ থেকে এ আম দেশের বিভিন্ন সুপারশপের পাশাপাশি বিদেশেও যাচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কাটিমন আমের হেক্টরপ্রতি ফলন ১২ থেকে ১৫ টন হতে পারে। ২৫৫ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৩ হাজার ৬০ থেকে ৩ হাজার ৮২৫ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রতি কেজি আম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। গড় মূল্য ১৮০ টাকা হিসেবে চলতি মৌসুমে প্রায় ৫৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকার আম বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, কাটিমন আম সারা বছর চাষ করা যায় এবং এতে কৃষকেরা ভালো লাভও পাচ্ছেন। এ কারণে গত বছরের তুলনায় এবার এ জাতের আমের চাষ বেড়েছে। কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
নওগাঁয় মোট আমবাগানের পরিমাণ প্রায় ৩০ হাজার ৩১০ হেক্টর। মৌসুমি জাতের আমের বাজার জুনের মধ্যেই অনেকটা শেষ হয়ে গেলেও কাটিমনের কারণে এবার অফ সিজনেও জেলার বাজারে আমের সরবরাহ ও বেচাকেনা অব্যাহত রয়েছে।
সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম




আপনার মতামত লিখুন