দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়েছে। গত সাত মাসের বেশি সময়ে এ দুই কারণে মোট ১ হাজার ২১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর ১০৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ১১০ জন। সর্বশেষ এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৭০। এর মধ্যে পরীক্ষায় ২৩ হাজার ২৭৩ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩৩ জন। চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৮ জন।
সাত মাসে মৃত্যু ১ হাজার ২১৪
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছেন ১০৪ জন। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৪।
সর্বশেষ এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ১১০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময়ে পরীক্ষায় নতুন করে ২৫ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ
গত সাত মাসে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ১৮ হাজার ৮৭০। এর মধ্যে ২৩ হাজার ২৭৩ জনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৯৪ হাজার ৬৩৩ জন। চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৯৮ জন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিনই হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে রোগী আসছেন। এতে ডেঙ্গুর মৌসুমে হাসপাতালগুলোতে রোগীর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। শয্যা পেতে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে রোগীর স্বজনদের।
এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা, শয্যা ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রাপ্যতা বাড়ানো জরুরি। আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, পানিশূন্যতা ও অপুষ্টির মতো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
হাম মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে এত মানুষের মৃত্যু জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান জোরদার, রোগী শনাক্তকরণ ও নজরদারি বাড়ানো এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোন বয়সের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, মৃতদের মধ্যে কতজন আগে টিকা পেয়েছিল এবং কোন এলাকায় সংক্রমণ ও প্রাণহানি বেশি—এসব তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মৃত্যুর কারণ নির্ণয় ও রোগীদের চিকিৎসায় কোনো ঘাটতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এসব তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, চলমান হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় মৃত্যুর ধারাবাহিকতার কারণ অনুসন্ধান, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় টিকাদান জোরদার করা জরুরি। পাশাপাশি রোগীদের চিকিৎসাব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থাকলে তা দূর করতে হবে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের তথ্য বিশ্লেষণ, রোগী শনাক্তকরণ ও নজরদারি জোরদার এবং মৃত্যুর কারণ নির্ণয় এখন গুরুত্বপূর্ণ কাজ। সন্দেহজনক ও পরীক্ষায় নিশ্চিত সংক্রমণের তথ্য মূল্যায়ন করে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে শিশুস্বাস্থ্যের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে।
প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর ধারাবাহিকতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। টিকাদানের আওতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে এ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম