হাসান মাহমুদ জয় | কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় অবস্থিত সোনাহাট স্থলবন্দর ও দুধকুমার নদের ওপর নির্মিত ঐতিহাসিক সোনাহাট সেতুটি বর্তমানে চরম জরাজীর্ণ হয়ে এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সেতুর কাঠামোগত মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গেলেও জীবনের পরম ঝুঁকি নিয়ে এর ওপর দিয়ে প্রতিদিন পারাপার হচ্ছে শত শত ভারী যানবাহন ও হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
একদিকে সেতুর প্রতিটি জয়েন্টের সংযোগস্থল খুলে ধসে পড়ছে, অন্যদিকে একটি নতুন ও আধুনিক সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বারবার কালক্ষেপণ, নানা অযুহাত ও দীর্ঘসূত্রিতায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মাঝে।
মেয়াদোত্তীর্ণ কাঠামো ও জরাজীর্ণ অবস্থা:
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা ও ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে তৎকালীন রেল চলাচলের জন্য দুধকুমার নদের ওপর এই সেতুটি নির্মিত হয়েছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এটি সড়ক যোগাযোগের উপযোগী হিসেবে ব্যবহার শুরু হয়। ভূরুঙ্গামারী উপজেলার সাথে সোনাহাট স্থলবন্দর এবং জেলা সদর কুড়িগ্রামের যোগাযোগের একমাত্র প্রধান মাধ্যম এই সেতুটির অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত আয়ুষ্কাল ফুরিয়েছে বহু বছর আগে। দীর্ঘদিন ধরে সঠিক ও কার্যকর সংস্কার না করায় সেতুর অবকাঠামো সম্পূর্ণ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
খুলে পড়ছে জয়েন্ট, নিত্যদিনের সঙ্গী দুর্ঘটনা:
রেল সেতু থেকে সড়ক সেতুতে রূপান্তর করা এই কাঠামোর লোহার পাত, প্লেট এবং নাট-বল্টুগুলো স্থানচ্যুত হয়ে পড়েছে। ব্রিজের প্রতিটি জয়েন্ট বা সংযোগস্থল আলগা হয়ে ভেতরে বড় বড় ফাঁক ও খাদের সৃষ্টি হয়েছে। বাইসাইকেল, মোটরসাইকেল, ভ্যান, রিকশা এবং ইজিবাইক চলাচলের সময় ওই ফাঁকে চাকা আটকে গিয়ে প্রতিদিন ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। পথচারীরা হেঁটে পার হতে গেলেও লোহার উঁচিয়ে থাকা পাতের সাথে হোঁচট খেয়ে আহত হচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন কোনো না কোনো যানবাহনের চাকা আটকে গিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত হওয়া এখন নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।
অতিরিক্ত লোডে চরম ঝুঁকিতে বাণিজ্য ও যোগাযোগ
সোনাহাট স্থলবন্দর বাংলাদেশের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান স্থলবন্দর। প্রতিদিন ভারত থেকে আমদানিকৃত শত শত ট্রাক পাথর ও কয়লা এই সেতু অতিক্রম করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। এছাড়া স্থানীয় দুধকুমার নদ থেকে উত্তোলিত বালুবাহী অসংখ্য ওভারলোড ড্রাম ট্রাক প্রতিদিন নিয়মিত যাতায়াত করে এই দুর্বল সেতুর ওপর দিয়ে। একেকটি ওভারলোড ভারী যানবাহন যখন ব্রিজের ওপর ওঠে, তখন পুরো সেতু থরথর করে কেঁপে ওঠে এবং বিকট শব্দের সৃষ্টি হয়। ভারী গাড়ির চাকা জয়েন্টে আটকে গিয়ে প্রায়শই সেতুতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, যা ঘণ্টা পর ঘণ্টা যোগাযোগ বন্ধ রাখে। যেকোনো মুহূর্তে ভারী লোডের কারণে সেতুটি ধসে পড়ে বড় ধরনের প্রাণহানি এবং সোনাহাট স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নতুন সেতু নিয়ে কালক্ষেপণ ও নানামুখী বাহানা
আঞ্চলিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং হাজার হাজার মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে এখানে একটি আধুনিক ও শক্তিশালী নতুন পাকা সেতু নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু স্থানীয় সচেতন মহল ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নতুন সেতু নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেবল আশ্বাসের বাণীই শুনিয়ে আসছে। বাস্তবে কাজের অগ্রগতি শূন্য। বিভিন্ন প্রযুক্তিগত জটিলতা, সমীক্ষা বা বাজেটের অযুহাত দেখিয়ে ফাইলবন্দি করে রাখা হয়েছে সেতু নির্মাণের মূল কাজ। জরাজীর্ণ এই সেতুতে মাঝে মাঝে সাময়িক জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে যানবাহন চলাচলের ব্যবস্থা করা হলেও স্থায়ী কোনো সমাধান করা হচ্ছে না।
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী, চালক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—বড় কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে বহু প্রাণহানি হওয়ার পরই কি টনক নড়বে প্রশাসনের?
এ বিষয়ে সোনাহাট স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী এবং সাধারণ পথচারীরা জানান, সেতুটি এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং আতঙ্কের আরেক নাম। সোনাহাট স্থলবন্দরের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে অবিলম্বে সব ধরনের কালক্ষেপণ ও অযুহাত বন্ধ করে দ্রুততম সময়ে নতুন একটি আধুনিক সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ ও জোর দাবি জানিয়েছেন সর্বস্তরের জনগণ।