দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুদের মৃত্যুর মিছিল থামছে না। সড়কে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, কমছে না সামগ্রিক দুর্ঘটনাও। ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ছয় বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৭ হাজার ৯৬৩ শিশু। অন্যদিকে, ১৩ বছরে সারা দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পৃথক প্রতিবেদন ও বার্তায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এসব তথ্যে সড়ক ও পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল তদারকি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। দুর্ঘটনা কমাতে শিশুবান্ধব সড়ক, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং পরিবহন খাতের প্রচলিত কার্যক্রম পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠন দুটি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শিশুদের মধ্যে মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহী হিসেবে প্রাণ হারিয়েছে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৯৫৮ জন। এ ছাড়া পথচারী হিসেবে ২ হাজার ৮১২ এবং বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী হিসেবে ২ হাজার ১৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
বয়সভিত্তিক হিসাবে নিহত শিশুদের মধ্যে ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৩ হাজার ৫৪৭ জন। এ ছাড়া ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী ২ হাজার ৮৮৪ এবং শূন্য থেকে ৫ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৩২ শিশু প্রাণ হারিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৫১৩ শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার পথে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। বসতবাড়ির আশপাশের সড়কে খেলার সময় প্রাণ হারিয়েছে ৯৬২ শিশু।
সড়কের ধরন অনুযায়ী, গ্রামীণ সড়কে ২ হাজার ৭১৩, আঞ্চলিক সড়কে ২ হাজার ৮২, মহাসড়কে ১ হাজার ৯৭৪ এবং শহরের সড়কে ১ হাজার ১৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পথচারী শিশুদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, থ্রি-হুইলারের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছে ১ হাজার ২৭১ শিশু। বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের মতো ভারী যানবাহনের চাপায় বা ধাক্কায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ১২৬ শিশু। এ ছাড়া প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, অ্যাম্বুলেন্স ও জিপের ধাক্কায় ৩১৭ এবং মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯৮ শিশু নিহত হয়েছে।
১৩ বছরে সড়কে প্রাণহানি ১ লাখ ২৫ হাজার
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ৭২ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৪০৫ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৪৯ জন।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার তথ্য পর্যবেক্ষণ করে এসব পরিসংখ্যান তৈরি করেছে সংগঠনটি। তবে হাসপাতালগুলোর চিত্র অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি হতে পারে বলে দাবি তাদের।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে বুধবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় এসব তথ্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের উদ্যোগ ও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, সরকার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমাতে আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা বলছে। কিন্তু একদিকে সরকারি কার্যক্রম বাড়ছে, অন্যদিকে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানিও বাড়ছে। সরকারের উদ্যোগের পরও কেন দুর্ঘটনা কমছে না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ উল্লেখযোগ্যভাবে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করা দরকার। সরকারের চলমান কার্যক্রমের নিরীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে গতানুগতিক উদ্যোগ থেকে বেরিয়ে এসে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরিবহন খাত পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও ট্রাফিক বিভাগের কার্যক্রমে অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে বলে তাদের মনে হয়েছে। এ ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তুলি আক্তার/ অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম