খুঁজুন
advertisement
advertisement
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২৯ ভাদ্র, ১৪৩৩

গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী

বার্তা বিভাগ
প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২:৪০ পূর্বাহ্ণ প্রতিবেদকের সকল নিউজ
গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কিছু নাম শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, সময়ের সঙ্গে তারা হয়ে ওঠেন একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের প্রতীক। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক নাম। একসময় সাধারণ এক গৃহবধূ হিসেবে সংসার ও সন্তান লালন-পালনেই যার ব্যস্ততা ছিল, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাকেই নামতে হয় রাজনীতির কঠিন ময়দানে। এরপর দীর্ঘ চার দশকের রাজনৈতিক জীবনে আন্দোলন, সংগ্রাম, কারাবরণ, রাষ্ট্রক্ষমতা ও বিরোধী দলের নেতৃত্ব—সবকিছু মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আপসহীন অবস্থান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখেও দৃঢ় থাকার কারণে তিনি অর্জন করেন ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি। তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম নির্বাচিত নারী সরকারপ্রধান হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে নেন।

শনিবার (১৫ আগস্ট) বেগম খালেদা জিয়ার ৮২তম জন্মদিন। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর পর এবারই প্রথম তার অনুপস্থিতিতে জন্মদিন পালিত হচ্ছে। জন্মদিনে তাকে স্মরণ করছেন বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক ও দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

জন্ম ও শৈশব

বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মের পর জীবনের প্রথম কয়েকটি বছর সেখানেই কাটে। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার পরিবার নিয়ে দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

দিনাজপুরেই খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে। পাঁচ বছর বয়সে তাকে দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করা হয়। পরে দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হয়ে ১৯৬৩ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ছিলেন ব্যবসায়ী। মা তৈয়বা মজুমদার ছিলেন সমাজকর্মী। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে খালেদা জিয়া ছিলেন তৃতীয় সন্তান।

বিবাহ ও সংসার জীবন

১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় সেনাবাহিনীর তরুণ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানম পুতুলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর কর্মস্থলের কারণে তাকে দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতে হয়।

জিয়াউর রহমানের কর্মসূত্রে ১৯৬৫ সালে তিনি স্বামীর সঙ্গে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানেও অবস্থান করেন। তাদের দুই সন্তান—বড় ছেলে তারেক রহমান এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন খালেদা জিয়া সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। বরং দুই সন্তানকে মানুষ করা ও সংসার সামলানোতেই তার জীবনের বড় সময় কেটেছে।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলো

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ খালেদা জিয়ার জীবনেও নিয়ে আসে চরম অনিশ্চয়তা। স্বাধীনতার সূচনালগ্নে মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। অন্যদিকে দুই সন্তানকে নিয়ে বিপদের মধ্যে পড়েন খালেদা জিয়া।

প্রথমদিকে তিনি চট্টগ্রামে আত্মগোপনে ছিলেন। পরে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠলে সন্তানদের নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে নারায়ণগঞ্জে এবং সেখান থেকে ঢাকায় আসেন। বিভিন্ন সময় স্বজন ও পরিচিতজনদের বাসায় আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৭১ সালের ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীর একটি বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়।

পরে দুই সন্তানসহ তাকে পুরোনো সংসদ ভবনে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে ঢাকা সেনানিবাসের একটি বাসায় বন্দি রাখা হয়। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তিনি সেনা হেফাজতেই ছিলেন।

স্বামীর মৃত্যু, বদলে গেল জীবন

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। মৃত্যুর আগের রাতে তিনি স্ত্রী খালেদা জিয়াকে ফোন করে পরদিন ঢাকায় ফেরার কথা জানিয়েছিলেন। সেটিই হয়ে ওঠে তাদের শেষ কথা।

স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর ভেঙে পড়েন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ ২১ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান তাকে এক কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়। তখনও রাজনীতিতে তার কোনো সক্রিয় ভূমিকা ছিল না।

কিন্তু জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি যখন নানা অভ্যন্তরীণ সংকট ও ভাঙনের মুখে পড়ে, তখন দলের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার দিকে তাকান।

গৃহবধূ থেকে রাজনীতির ময়দানে

১৯৮২ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিকভাবে ক্ষমতা দখল করলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। বিএনপির ভেতরেও দেখা দেয় বিভক্তি।

এই সময়ই অনেকটা আকস্মিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।

এরপর শুরু হয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন নেত্রী’

এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন খালেদা জিয়া। ১৯৮৩ সালে গঠিত সাতদলীয় জোটের নেতৃত্বও দেন তিনি।

১৯৮৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচন বর্জনসহ এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তার কঠোর অবস্থান তাকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে। আন্দোলনের সময় তাকে একাধিকবার আটক করা হয়।

ক্রমেই তীব্র হতে থাকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজপথ উত্তাল হয়ে ওঠে।

অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদের পতন ঘটে। স্বৈরাচারবিরোধী সেই আন্দোলনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা তাকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।

প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। খালেদা জিয়া নিজে পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে সবকটিতেই জয়ী হন।

১৯৯১ সালের ১৯ মার্চ তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

তার প্রথম মেয়াদে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। শিক্ষা, নারী কর্মসংস্থান, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তৈরি পোশাক খাতের সম্প্রসারণ ও নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ বৃদ্ধিও ওই সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হিসেবে উঠে আসে।

১৯৯৬ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

তবে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের আন্দোলন ও টানা হরতালের কারণে রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়। একপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালুর দাবি জোরালো হলে খালেদা জিয়ার সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সংবিধান সংশোধন করে।

এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে নতুন নির্বাচনের পথ তৈরি করেন তিনি।

১৯৯৬ সালের নির্বাচন ও বিরোধী দলীয় নেতৃত্ব

১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও ১১৬টি আসন পেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

খালেদা জিয়াও পাঁচটি আসন থেকে নির্বাচিত হন। এরপর তিনি সংসদে বিরোধী দলের নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

চারদলীয় জোট ও তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী

১৯৯৯ সালে বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট গঠিত হয়। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী ঐক্যজোট জোটে যুক্ত হয়।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

এর মধ্য দিয়ে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।

২০০১-২০০৬: তৃতীয় মেয়াদের সরকার

এই মেয়াদে নারী শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি, বিনামূল্যে শিক্ষা, খাদ্য সহায়তা এবং নারী ক্ষমতায়নের নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় খালেদা জিয়া ২৯তম অবস্থানে ছিলেন।

এক-এগারো ও কারাবরণ

২০০৬ সালে সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন খালেদা জিয়া। কিন্তু ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে।

একপর্যায়ে বিএনপির ওপর চাপ সৃষ্টি এবং দল ভাঙার নানা প্রচেষ্টা শুরু হয়। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ভোরে ঢাকা সেনানিবাসের বাসা থেকে খালেদা জিয়া ও তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর আগে ৭ মার্চ গ্রেপ্তার হন তারেক রহমান।

খালেদা জিয়াকে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার একটি বাড়িতে সাবজেল হিসেবে আটক রাখা হয়। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান।

২০০৮ সালের নির্বাচন ও বিরোধী দলের নেতৃত্ব

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয় এবং বিরোধী দলে অবস্থান নেয়।

খালেদা জিয়া তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতে জয়ী হন এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক সংকট ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন

পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হয়। বিএনপি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়। এরপরও বিএনপির আন্দোলন অব্যাহত থাকে।

খালেদা জিয়াকে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের ব্যাপক গ্রেপ্তার নিয়ে সে সময় দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

মামলা ও কারাবাস

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়াকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তাকে পুরান ঢাকার পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়।

পরে জিয়া চ্যারিট্যাবল ট্রাস্ট মামলাতেও তাকে সাজা দেওয়া হয়। দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে তার শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে।

২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি।

অসুস্থতা ও চিকিৎসা

কারাবন্দি থাকা অবস্থায় খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। কিডনি, লিভার, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় তিনি ভুগতে থাকেন।

তার চিকিৎসা নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবিও জানায় বিএনপি ও তার পরিবার।

২০১৮ সালের নির্বাচন ও পরবর্তী আন্দোলন

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অংশ নেয়। নির্বাচনে বিএনপি জোট বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে।

এরপর নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিএনপি আন্দোলন চালিয়ে যায়।

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও মুক্তির নতুন অধ্যায়

২০২৪ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। একপর্যায়ে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। এরপর খালেদা জিয়ার মুক্তির পথও পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, কারাবাস ও অসুস্থতার পর তিনি নতুন বাস্তবতায় ফিরে আসেন।

শেষ অধ্যায়

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়া যেমন তিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তেমনি একাধিকবার বিরোধী দলের নেতৃত্বও দিয়েছেন। রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা—দুই ক্ষেত্রেই তার ছিল দীর্ঘ অভিজ্ঞতা।

স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যে নারী রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন, সময়ের পরিক্রমায় তিনিই হয়ে ওঠেন বিএনপির অবিসংবাদিত নেতা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা বিতর্ক, বিরোধ, মামলা, আন্দোলন ও সংকটের মধ্যেও তিনি দলের নেতৃত্ব ধরে রাখেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। তার জানাজায় বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন এবং দেশজুড়ে শোকের আবহ তৈরি হয়।

তার মৃত্যুর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার নাম, রাজনৈতিক অবস্থান ও দীর্ঘ সংগ্রামের অধ্যায় আলোচনায় রয়েছে।

গৃহবধূ থেকে ইতিহাসের অংশ

খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি সম্ভবত এখানেই—যে নারী একসময় রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে ছিলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তিনিই হয়ে ওঠেন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান। এরপর রাজপথের আন্দোলন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা—প্রতিটি অধ্যায়েই রেখে যান নিজের রাজনৈতিক ছাপ।

সমর্থকদের কাছে তিনি গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতীক, আর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাছে ছিলেন দীর্ঘদিনের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবস্থান যে গুরুত্বপূর্ণ, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের সরকারপ্রধান এবং ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে ওঠার এই দীর্ঘ পথচলাই বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অধ্যায়।

সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

মোটরসাইকেলে ঢাকা যাওয়ার পথে প্রাণ গেল সাংবাদিকের

বার্তা বিভাগ
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫:১৫ অপরাহ্ণ প্রতিবেদকের সকল নিউজ
মোটরসাইকেলে ঢাকা যাওয়ার পথে প্রাণ গেল সাংবাদিকের

 যোগফল প্রতিবেদক:

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় সড়ক দুর্ঘটনায় এশিয়া টেলিভিশনের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি কাজী আশরাফ (৪৬) নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা মাহামুদুল হাসান অনিক নামে আরও একজন আহত হয়েছেন।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ভাঙ্গার মনসুরাবাদ এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহত কাজী আশরাফ নড়াইলের লোহাগড়া পৌরসভার গোপিনাথপুর গ্রামের কাজী শামসুর রহমানের ছেলে। তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ছিলেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, সকালে ব্যক্তিগত কাজে কাজী আশরাফ ও মাহামুদুল হাসান অনিক মোটরসাইকেলে করে লোহাগড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। মনসুরাবাদ এলাকায় পৌঁছালে চলন্ত মোটরসাইকেলটির সঙ্গে একটি বাসের ধাক্কা লাগে। এতে দুজনই গুরুতর আহত হন।

পরে পুলিশ ও স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কাজী আশরাফের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে ঢাকায় নেওয়ার পথে দুপুর ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ভাঙ্গা হাইওয়ে থানার উপপরিদর্শক সোহেল রানা জানান, সকালে মনসুরাবাদ এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহী দুজন আহত হন। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হলে একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় ঢাকায় পাঠানো হয়। পরে পথে তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

চরিত্র পেতে আপত্তিকর প্রস্তাব, ‘না’ বলেই এগিয়ে যান স্যান্ড্রা বুলক

বার্তা বিভাগ
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:০৬ অপরাহ্ণ প্রতিবেদকের সকল নিউজ
চরিত্র পেতে আপত্তিকর প্রস্তাব, ‘না’ বলেই এগিয়ে যান স্যান্ড্রা বুলক

হলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে অভিনেত্রী স্যান্ড্রা বুলককে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অডিশন দিতে গিয়ে চরিত্র পাওয়ার বিনিময়ে আপত্তিকর প্রস্তাবও পেয়েছিলেন তিনি। এমনকি কয়েকজন তাকে সরাসরি পোশাক খুলতে বলেছিলেন বলেও জানিয়েছেন এই অভিনেত্রী।

সম্প্রতি বন্ধু ও সহ-অভিনেত্রী জেনিফার অ্যানিস্টনের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের এসব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন স্যান্ড্রা। তিনি জানান, নিউইয়র্কে ওয়েট্রেস হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তখন নিয়মিত অভিনয়ের অডিশন দিতেন।

স্যান্ড্রার ভাষ্য অনুযায়ী, অডিশনে এমন কিছু পুরুষের মুখোমুখি হতে হয়েছে, যারা চরিত্র পাওয়ার বিনিময়ে অশোভন প্রস্তাব দিতেন। কেউ কেউ তাকে সরাসরি ‘প্যান্ট খুলতে’ বলতেন। এসব পরিস্থিতিতে তার উত্তর ছিল স্পষ্ট—‘না, এই চরিত্র আমার জন্য নয়।’

তবে এমন অভিজ্ঞতা তাকে অভিনয়ের স্বপ্ন থেকে সরিয়ে দিতে পারেনি। বরং সংগ্রামের সেই সময়েও কাজ পাওয়ার অনিশ্চয়তার ভয়কে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেছেন তিনি। তার উপলব্ধি ছিল, একজন সংগ্রামী অভিনেতার মনে সবসময়ই থাকে—হয়তো এরপর আর কোনো কাজ পাওয়া যাবে না। তাই সুযোগ পেলে সেটিকে কাজে লাগিয়েই সামনে এগোতে হয়।

ক্যারিয়ারে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর স্যান্ড্রা বুলক বুঝতে পারেন, একটি নির্দিষ্ট ঘরানার মধ্যে আটকে থাকলে অভিনেত্রী হিসেবে নিজের সামর্থ্য পুরোপুরি তুলে ধরা সম্ভব নয়। রোমান্টিক কমেডির মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পেলেও একসময় এই পরিচিতিই তার জন্য সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৯৫ সালের ‘হোয়াইল ইউ ওয়ার স্লিপিং’ ছবির মাধ্যমে রোমান্টিক কমেডিতে তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এরপর ‘ফোর্সেস অব নেচার’, ‘টু উইকস নোটিশ’, ‘হোপ ফ্লোটস’ ও ‘মিস কনজেনিয়ালিটি’র মতো ছবিতে অভিনয় করে বড় তারকা হয়ে ওঠেন তিনি।

কিন্তু জনপ্রিয়তার সেই ধারার বাইরে নিজেকে প্রমাণ করতে মধ্য ২০০০-এর দশকে রোমান্টিক কমেডি থেকে বিরতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্যান্ড্রা। জেনিফার অ্যানিস্টনের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানান, তখন সচেতনভাবেই মনে করেছিলেন—এবার তাকে অন্য ধরনের চরিত্রে কাজ করতে হবে।

এরপর ২০০৪ সালের ‘ক্রাশ’ ছবিতে ভিন্ন এক স্যান্ড্রা বুলককে দেখেন দর্শক। নাটকীয় এই ছবিতে অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেন, শুধু রোমান্টিক কমেডির অভিনেত্রী হিসেবে নয়, গুরুতর চরিত্রেও নিজের দক্ষতা দেখাতে পারেন তিনি।

‘ক্রাশ’ সেরা ছবির অস্কার জেতে। ছবিটিতে অভিনয়ের জন্য স্যান্ড্রা স্ক্রিন অ্যাক্টরস গিল্ড অ্যাওয়ার্ডে সেরা সম্মিলিত অভিনয়ের পুরস্কারও পান।

পরবর্তী সময়ে আবারও রোমান্টিক কমেডিতে ফেরেন স্যান্ড্রা। ২০০৯ সালে রায়ান রেনল্ডসের সঙ্গে ‘দ্য প্রোপোজাল’ ছবিতে অভিনয় করেন। ছবিটি বক্স অফিসে বড় সাফল্য পায়। একই বছর মুক্তি পাওয়া ‘অল অ্যাবাউট স্টিভ’ অবশ্য প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

তবে ওই বছরই ‘দ্য ব্লাইন্ড সাইড’ ছবিতে অভিনয় করে ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন পান স্যান্ড্রা। ছবিটির জন্য সেরা অভিনেত্রী হিসেবে অস্কার জেতেন তিনি।

এরপরও কমেডি ঘরানাকে পুরোপুরি বিদায় জানাননি এই অভিনেত্রী। ২০২২ সালে চ্যানিং ট্যাটামের সঙ্গে ‘দ্য লস্ট সিটি’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। মহামারির পর মুক্তি পাওয়া ছবিটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯২ মিলিয়ন ডলার আয় করে বক্স অফিসে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়।

ক্যারিয়ারের শুরুতে অপমানজনক ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেও সেসব অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে নিজের অভিনয় দক্ষতা দিয়ে হলিউডে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন স্যান্ড্রা বুলক।

সাদিয়া পারভিন / অনলাইন ডেস্ক / যোগফল.কম

সাপের ভয় জয় করে ‘সাপুড়ে আপা’ মিতুর ছুটে চলা।

বার্তা বিভাগ
প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৬:২৬ অপরাহ্ণ প্রতিবেদকের সকল নিউজ
সাপের ভয় জয় করে ‘সাপুড়ে আপা’ মিতুর ছুটে চলা।

একসময় সাপ দেখলেই ভয় পেতেন জান্নাতুন নেসা মিতু। এখন সেই সাপের খবর পেলেই ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে যান তিনি। বাড়ির ঘর, মুরগির খোপ কিংবা স্টোররুমের মেঝের নিচে—যেখানেই সাপের দেখা মিলুক, খবর পেলে সেখানে পৌঁছে সেটিকে নিরাপদে উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেন প্রাকৃতিক আবাসস্থলে।

নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় প্রতিদিনই মিতুর কাছে আসে সাপ উদ্ধারের ফোন। কখনো চৌমুহনী, কখনো বেগমগঞ্জ, মাইজদী কিংবা কবিরহাট। ক্লাস, পরীক্ষা কিংবা অ্যাসাইনমেন্টের ব্যস্ততার মধ্যেও সময় পেলেই ছুটে যান রেসকিউ করতে।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বন্যপ্রাণিবিদ্যা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করছেন মিতু। তার বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে হলেও বেড়ে উঠেছেন ঢাকায়।

সাপ উদ্ধারের কাজ করতে করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের কাছেও বদলে গেছে তার পরিচয়। কেউ তাকে ডাকেন ‘সাপুড়ে আপা’, কেউ ‘কালনাগিনী’, আবার কেউ মজা করে বলেন ‘বেঁদে মিতু’। এসব ডাকনামের পেছনে রয়েছে ভয়কে জয় করে বন্যপ্রাণী রক্ষার কাজে নিজেকে যুক্ত করার গল্প।

অনার্স শেষ করার পর মাস্টার্স শুরু হতে কিছুটা সময় লাগছিল মিতুর। সেই সময়টাকে নিজের পড়াশোনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন তিনি। বন্যপ্রাণীর প্রতি আগ্রহ থেকেই খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, সাপ নিয়ে কাজ করা নারী রেসকিউয়ারের সংখ্যা খুবই কম। বিষয়টি তাকে আগ্রহী করে তোলে।

পরে সাপ নিয়ে জানতে গিয়ে পরিচয় হয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ওয়াইল্ডলাইফ স্নেক অ্যান্ড রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশ’ (ডব্লিউএসআরটিবিডি)-এর সঙ্গে। সংগঠনটির লার্নার ব্যাচে ভর্তি হয়ে প্রায় আট মাস সাপ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হাতে-কলমে রেসকিউ প্রশিক্ষণ শুরু করেন।

পরবর্তীতে সংগঠনের অভিজ্ঞ সদস্যদের সঙ্গে বিভিন্ন উদ্ধার অভিযানে অংশ নিতে থাকেন মিতু। কোন প্রজাতির সাপের ক্ষেত্রে কী কৌশল ব্যবহার করতে হয়, কীভাবে নিরাপদে সাপ ধরতে হয় এবং মানুষের ভিড় বা আতঙ্ক কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়—এসবও শেখেন তিনি।

মিতুর ভাষায়, শুরুতে সাপকে খুব ভয় পেতেন। তবে ধীরে ধীরে সাপের আচরণ ও গতিবিধি সম্পর্কে জানার পর সেই ভয়ই দায়িত্ববোধে পরিণত হয়েছে।

প্রথম সাপ উদ্ধারের স্মৃতিও তার কাছে বিশেষ। স্নাতক শেষ করার পর সন্দ্বীপে একটি সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনে প্রথম সাপ ধরেন তিনি। এরপর নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত রেসকিউ অভিযানে যেতে শুরু করেন।

তার স্মরণীয় উদ্ধার অভিযানের মধ্যে রয়েছে কবিরহাটে দুটি পদ্মগোখরো উদ্ধারের ঘটনা। একটি বাড়িতে মুরগি ও কবুতর পালনের সময় কয়েক দিন ধরে ডিম উধাও হচ্ছিল এবং কিছু বাচ্চা মারা যাচ্ছিল। পরে বাড়ির লোকজন দেখতে পান, মুরগির ঘরের মেঝেতে দুটি পদ্মগোখরো রয়েছে।

সাপ দুটিকে মেরে ফেলার বদলে বাড়ির এক যুবক রেসকিউ সংগঠনের হটলাইনে যোগাযোগ করেন। পরে মিতুর কাছে কলটি আসে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি নিরাপদে দুটি সাপ উদ্ধার করেন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সাপ সম্পর্কে সচেতন করেন এবং এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকতে হয়, সে বিষয়েও জানান।

মিতু জানান, রেসকিউয়ের সময় আশপাশের মানুষের নানা পরামর্শ থাকলেও সেদিকে মনোযোগ না দিয়ে সাপের গতিবিধি বুঝতে হয়। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে সঠিক কৌশলে সাপটিকে উদ্ধার করতে হয়। এ জন্য প্রতিটি অভিযানের আগে মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও সঙ্গে রাখেন তিনি।

রেসকিউয়ের আগে সম্ভব হলে সাপটির ছবি বা ভিডিও পাঠাতেও বলেন মিতু। কারণ অনেক সময় বাড়ির লোকজন নির্বিষ সাপের কথা বললেও ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষধর সাপের দেখা মেলে। আগে থেকে ছবি বা ভিডিও পেলে পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া সহজ হয়।

মাইজদীর রশিদ কলোনির একটি উদ্ধার অভিযানও তার মনে দাগ কেটেছে। বন্যার পর একটি বাড়িতে সাপের আনাগোনা বেড়ে যায়। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে মিতু জানতে পারেন, সাপটি স্টোররুমের মেঝের নিচে লুকিয়ে আছে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেঝে খোঁড়ার পরও সাপটির দেখা মিলছিল না। একপর্যায়ে ইঁদুরের একটি গর্তে সাপটির সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে ১৭টি ডিমসহ সাপটিকে উদ্ধার করেন তিনি।

তবে নারী হওয়ায় রেসকিউ করতে গিয়ে নানা প্রশ্নের মুখেও পড়তে হয় মিতুকে। অনেকেই অবাক হয়ে জানতে চান, ‘আপনি তো মেয়ে, সাপ ধরবেন কীভাবে?’ শুরুতে তার পরিবারও বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি। রেসকিউ অভিযানে যেতে নিষেধ করত। সময়ের সঙ্গে মিতুর কাজ সম্পর্কে ধারণা বদলেছে পরিবারেরও। এখন তারা তার পাশে রয়েছে।

মিতুর কাছে সাপ উদ্ধারের সবচেয়ে বড় আনন্দ হলো একটি প্রাণকে নিরাপদে তার নিজস্ব পরিবেশে ফিরিয়ে দিতে পারা। তার মতে, সাপ সম্পর্কে জানার পর ভয় অনেকটাই কেটে গেছে; বরং প্রাণীটির প্রতি সহমর্মিতাই বেড়েছে।

সাপ দেখলেই মেরে ফেলার প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে মিতুর। তার মতে, আতঙ্কের কারণে দেশে অনেক বন্যপ্রাণী মারা যায়, যার মধ্যে সাপ অন্যতম। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কৃষিজমির ক্ষতিকর ইঁদুর খেয়ে সাপ কৃষকের উপকার করে। একইভাবে জলজ পরিবেশেও বিভিন্ন প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে তারা ভূমিকা রাখে। বিষধর সাপের বিষ নিয়েও গবেষণা ও অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ হয়। তাই বিষধর কিংবা নির্বিষ—প্রতিটি সাপই প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করেন মিতু।

ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ নিয়ে গবেষণার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে আরও বেশি কাজ করতে চান তিনি। মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমিয়ে তাদের সহাবস্থান নিশ্চিত করাই তার অন্যতম লক্ষ্য।

একসময় যে সাপকে দেখলেই ভয় পেতেন, এখন সেই সাপের খবর পেলেই ছুটে যান জান্নাতুন নেসা মিতু। মানুষের আতঙ্ক কমানো আর একটি প্রাণকে নিরাপদে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার এই কাজেই ধীরে ধীরে তিনি হয়ে উঠেছেন নোবিপ্রবির বন্ধুদের ‘সাপুড়ে আপা’।